জ্বালানি খাতে ব্যবসায়িক ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা থাকতে পারে ২০২৫ সালেও

বৈশ্বিক অর্থনীতির অভিমুখ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রভাবক জ্বালানি খাত।

বৈশ্বিক অর্থনীতির অভিমুখ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রভাবক জ্বালানি খাত। অর্থনীতির সাধারণ প্রবণতার মধ্যে রয়েছে ব্যবসায়িক ও বিনিয়োগ চক্র, যা পূর্ব অনুমানযোগ্য। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন ও অপ্রত্যাশিত ঘটনায় এ ধরনের চক্রের নিয়মিত ছন্দ পাল্টে যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো, যা ২০২৫ সালের জ্বালানি খাতকে অনিশ্চিত করে তুলতে পারে।

সাম্প্রতিক এ অনিশ্চয়তার বিভিন্ন দিক নিয়ে দ্য ন্যাশনালের এক বিশ্লেষণে তুলে ধরেছেন কামার এনার্জির প্রধান নির্বাহী ও ‘দ্য মিথ অব দি অয়েল ক্রাইসিস’ বইয়ের লেখক রবিন এম মিলস।

তার মতে, ব্যবসায়িক ও বিনিয়োগ চক্রের সংযোগস্থলে রয়েছে জ্বালানি চক্র। সাধারণত ব্যয়বহুল, দীর্ঘমেয়াদি ও পুঁজিনিবিড় উদ্যোগ হয়ে থাকে জ্বালানি ও খনিজ প্রকল্পগুলো। গভীর সমুদ্র তেলক্ষেত্র, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) প্লান্ট, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা ইউরেনিয়াম বা তামার খনি গড়ে তুলতে এক দশক বা তারও বেশি সময় লাগে।

সাধারণত জ্বালানির মূল্য যখন ঊর্ধ্বমুখী থাকে তখন এ ধরনের প্রকল্প অনুমোদন পেয়ে থাকে, যাতে প্রয়োজন হয় প্রচুর অর্থপ্রবাহ এবং সরকারি সহায়তা। কিন্তু এসব প্রকল্প যখন কার্যকর হতে শুরু করে তখন অর্থনৈতিক পরিবেশ সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে। ২০২৫ সালে পরিস্থিতি সেদিকে গড়াতে পারে।

রবিন এম মিলস বলেন, ‘বৈশ্বিক অর্থনীতি নিজস্ব গতিতে চলে। কখনো এটি জ্বালানি চক্রের সঙ্গে সমান্তরাল হয়, যেমনটি ছিল এ শতকের গোড়ার দিকে। তখন চীনের প্রবৃদ্ধি চাহিদার বিপরীতে জ্বালানি তেল ও গ্যাসে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ঘাটতি দেখা যায়, যা জ্বালানি দুটির মূল্য ঊর্ধ্বমুখী করে। আবার কখনো বিপরীত পরিস্থিতিও দেখা যায়। সত্তরের দশকে মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্বের বাড়বাড়ন্ত সময়ে জ্বালানির মূল্য বেড়ে যায়। আবার নব্বইয়ের দশকে অর্থনীতি শক্তিশালী হলেও জ্বালানির মূল্য কমে যায়।

সাম্প্রতিক বছরে অর্থনৈতিক চক্রে স্বাভাবিক নিদর্শন বা উত্থান-পতন কম লক্ষণীয়। ২০০৮-০৯ সালের আর্থিক সংকটের পর বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্থির থাকলেও বিশেষ শক্তিশালী হয়নি, বরং তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। মাঝে কভিড মহামারী এবং পরবর্তী পুনরুদ্ধারের ব্যাঘাত ছাড়া বড় কোনো অস্থিরতা নেই।

অন্যদিকে জ্বালানি তেল ও গ্যাস শিল্পে ২০১৬ সালের মূল্য পতনের পর থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো পুনরুত্থান দেখা যায়নি। এতে ব্যতিক্রম ছিল কভিড এবং ২০২২ সালের শুরুতে ইউক্রেনে রুশ আক্রমণের ধাক্কা। তবে ওপেকের নীতির কারণে ২০২২ সালের শেষ থেকে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে।

২০২৫ সালে ওপেক-বহির্ভূত দেশগুলো জ্বালানি তেল উত্তোলন বাড়াবে, একই সময়ে অতিরিক্ত উত্তোলন ক্ষমতা তৈরি হবে ওপেকের। অর্থাৎ জ্বালানি তেল উত্তোলনে অধিক বিনিয়োগের পক্ষে রয়েছে ওপেক, যা আশির দশকের শুরুতে এবং এ শতকের প্রথমের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ঘটেছিল। কিন্তু ওপেক-বহির্ভূত দেশে উত্তোলন বাড়ার বিপরীতে ২০২৫ সালে নিজেদের কৌশল নিয়ে ওপেকের মধ্যে অনাস্থা তৈরি হতে পারে বলে মত রবিন এম মিলসের।

ভবিষ্যতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) খাতে শক্তিশালী সম্প্রসারণ দেখা যেতে পারে, যা বিশেষত কাতার ও যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর। তবে এটি ২০২৭ সাল বা এরপর বাস্তবায়ন হতে পারে। এমন প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ ইউরোপীয় গ্যাস বাজারের ভারসাম্যে কিছু ফাটল দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে শীতল আবহাওয়া, উইন্ড মিল চলার মতো বাতাসের গতির অভাব, রুশ গ্যাসের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত পদক্ষেপ এবং জলবায়ু ও মানবাধিকার নীতির কারণে কাতারের মতো সরবরাহকারীদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া।

অর্থাৎ প্রাকৃতিক ও ভূরাজনৈতিক প্রবণতা জ্বালানি বাজারের স্বাভাবিক চক্রকে ছাপিয়ে যেতে পারে। প্রধান আন্তঃসংযোগ প্রবণতাগুলোর মধ্যে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন, নতুন জ্বালানি প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো বিদ্যুৎখেকো প্রযুক্তির উত্থান, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং বাণিজ্য প্রবৃদ্ধির হ্রাস এবং অর্থনৈতিক ও জনসংখ্যাগত স্থিতিশীলতা।

রবিন এম মিলসের বিশ্লেষণ অনুসারে, এসব প্রবণতা কম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বিশেষত তেলের মতো জ্বালানির চাহিদা কমিয়ে দেয়। চীনে এখন মোট গাড়ি বিক্রির অর্ধেকের বেশি দখল করে আছে ইভি। শীর্ষস্থানীয় পরিশোধনকারী সিনোপেক ২০২৭ সালে চীনের জ্বালানি তেলের চাহিদার শিখরে ওঠার পূর্বাভাস দিচ্ছে।

বর্তমানে সামগ্রিক জ্বালানি রূপান্তরের ধীরগতি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। বাস্তবে কিছু অঞ্চলে দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। এছাড়া ছোট পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর, পারমাণবিক ফিউশন, উন্নত ভূতাপীয় শক্তি, হাইড্রোজেন এবং নতুন ব্যাটারি প্রযুক্তিতে অগ্রগতি হতে পারে, তবে এগুলো ২০২৫ সালে জ্বালানি খাতে তেমন প্রভাব ফেলবে না।

এছাড়া পূর্বানুমানযোগ্য কিছু অপ্রত্যাশিত ঘটনা বা অভিঘাত আসতে পারে বছরটিতে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আসন্ন ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে চ্যালেঞ্জে ফেলতে পারে। ট্রাম্প এরই মধ্যে মেক্সিকো, কানাডা ও পানামার মতো দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন এবং ইউরোপকে আরো বেশি মার্কিন জ্বালানি তেল ও গ্যাস কিনতে বলেছেন। এসব কার্যক্রম বৈশ্বিক বাণিজ্য ও ব্যবসায় অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে। এছাড়া চীন, ইরান ও রাশিয়ার ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা জ্বালানি খাতে প্রভাব ফেলতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে আকস্মিক কোনো দুর্যোগ। এসব আশঙ্কার মধ্যে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির জন্য জ্বালানি খাতে ঐক্য প্রয়োজন বলে মন্তব্য রবিন এম মিলসের।

আরও